মনোয়ার হোসেন রতন।।
পৃথিবী মানবতার একমাত্র আশ্রয়স্থল। এ গ্রহে ছয় লক্ষ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষ টিকে আছে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—যে সভ্যতা মানুষকে জ্ঞানের আলো দিয়েছে, সেই সভ্যতাই আজ পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। মাত্র চার শতাব্দীর শিল্প বিপ্লব ও ভোগবাদী সংস্কৃতি পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করেছে। আজ আমরা এমন এক অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রশ্ন কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নয়—আমাদের নিজেদের বাঁচার।
১৯৭২ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত প্রথম পরিবেশ সম্মেলনে রাষ্ট্রনেতারা ঘোষণা দিয়েছিলেন—“মানুষ যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তবে প্রকৃতিও মানুষকে বাঁচতে দেবে না।” এরপর রিও সামিট, কিয়োটো প্রটোকল, প্যারিস চুক্তি—সবই ছিল পৃথিবী রক্ষার প্রচেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১৯৯০ সালের পর থেকে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ ৬০% বেড়েছে।
হিমালয়ের হিমবাহ গলছে, বাংলাদেশ ডুবে যাচ্ছে, আফ্রিকার মরুভূমি ছড়িয়ে পড়ছে, প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন—পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যদি আরও বাড়ে, তবে অর্ধেক পৃথিবী মানুষের বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাবে।
আমরা ভুলে গেছি—প্রকৃতি ছাড়া সভ্যতা নেই, নদী ছাড়া নগর নেই, বৃক্ষ ছাড়া জীবন নেই। আজ মানুষ মহাকাশে উপনিবেশ বানানোর স্বপ্ন দেখছে; অথচ যে পৃথিবী তাকে জন্ম দিয়েছে, সেই পৃথিবীকে রক্ষার দায়িত্ব নিতে ভুলে যাচ্ছে।
যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়, তবে কোনো মহাকাশই মানবতার আশ্রয় হতে পারবে না।
অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি—সবকিছু মুনাফার দাসে পরিণত হয়েছে। পৃথিবী যেন আজ এক অসুস্থ রোগীর মতো, আর মানুষই তার প্রধান রোগজীবাণু।
লোভ, প্রতিযোগিতা, স্বার্থপরতা ও যুদ্ধের দৌরাত্ম্য পৃথিবীর ধ্বংসের মূল কারণ। অস্ত্রের আগুন যেমন জীবন কেড়ে নেয়, তেমনি অদৃশ্য ধ্বংস ডেকে আনে দূষণ, বন উজাড়, নদী দূষণ, সমুদ্রের অম্লীকরণ।
সমাধান কোনো একক জাতির হাতে নেই, সমাধান বিশ্ব সম্প্রদায়ের সম্মিলিত চেষ্টায়।
১. সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা: পরিবেশ রক্ষায় কেবল বক্তৃতা নয়, কার্যকর নীতি দরকার।
২. সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার: নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
৩. জনসচেতনতা: প্রতিটি মানুষকে দায়িত্ব নিতে হবে—সে পৃথিবীকে ধ্বংস করবে না।
৪. টেকসই উন্নয়ন: ভোগবাদী মডেল নয়, টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৫. শিক্ষার ভূমিকা: শিশুদের শেখাতে হবে—প্রকৃতি কেবল সম্পদ নয়, সে আমাদের মা।
আজ পৃথিবীর শিশুরা প্রশ্ন করছে—“এ পৃথিবীটা কি কেবল তোমাদের, নাকি আমাদেরও?” গ্রেটা থানবার্গের মতো কিশোর-কিশোরীরা রাস্তায় নেমে বলছে: “তোমরাকে আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার অধিকার কে দিলো?”
এই প্রশ্ন কেবল আবেগ নয়, এটি মানবতার বিবেক জাগানোর শিঙ্গা।
আমরা যদি সত্যিই আগামী প্রজন্মকে ভালোবাসি, তবে আজই শপথ নিতে হবে—এই পৃথিবীকে আমরা লুণ্ঠনের মাঠ নয়, ভালোবাসার আশ্রয়স্থল করব।
জাতিসংঘ, বিজ্ঞানী, কবি, দার্শনিক—সবাই এক সুরে বলছে: “পৃথিবীকে রক্ষা করো, নইলে সভ্যতার ইতিহাস ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।”
বিশ্ব বিবেক, জাগো! স্বপ্নের পৃথিবীকে রক্ষা করো। কারণ পৃথিবী ছাড়া মানবতার কোনো ইতিহাস লেখা হবে না।
মোবাইল: ০১৭১৭-৯১০৭৭৭
ইমেইল: newsamod@gmailcom
www.amodbd.com