ঠাডায়- বজ্রপাতে আর কত মৃত্যু?

 

।। মাসুক আলতাফ চৌধুরী।। 

পাশের খোলা জমিতে ফুটবল খেলতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা গেছে দশম শ্রেণি পড়ুয়া সিয়াম (১৪), কুমিল্লা মুরাদনগর উপজেলার নবীপুর পশ্চিম ইউনিয়নের উত্তর ত্রিশ গ্রামে শুক্রবার সকালে (১০ মে)। একই দিন বাগেরহাটের স্মরণখোলায় কাজের সময় বজ্রপাতে- ঠ্যাডা- বাজ পড়ে মাঠে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এতে আহত হয়েছে আরও ৬ জন। এখন বৈশাখ শেষ, জৈষ্ঠ্যের শুরু। গ্রীষ্মের ঝড়ো হাওয়া আর বজ্রবৃষ্টির মৌসুম। এবার অসহ্য গরম- তাপদাহ হয়েছে । টানা একমাস তাপদাহের পর স্বস্তির বৃষ্টিতেও প্রথম দিন ২ মে বজ্রপাতে সারা দেশে মারা গেছে ১১ জন। ওইদিন কুমিল্লাতেও দু’ঘন্টার ব্যবধানে দেবিদ্বার, সদর দক্ষিণ, চান্দিনা ও বুড়িচং- এ চার উপজেলায় মারা গেছেন ৪ জন। তাদের দু’জন কৃষক, মাঠে কাজ করছিলেন। একজন সাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন। অন্যজন বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এভাবে প্রতিদিনই ঝড়ো বৃষ্টির সময় বজ্রপাতে ঘটছে প্রাণহানি। এখন বৃষ্টি স্বস্তির, সাথে বজ্রপাত মহাবিপর্যয়। তার ওপর বজ্রপাতের ভরা মৌসুম চলছে। তাই মৃত্যু বাড়ছে। বজ্রপাত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাড়বে, বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন তবে কমানো যায় মৃত্যু, মৃত্যুঝুঁকি। সাবধানতা-সচেতনতা, সর্তকতা আর বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা কমাতে পারে মৃত্যু।

এপ্রিল পুরো মাসসহ মে’র ৮ তারিখ পর্যন্ত ৩৮ দিনে দেশে ৭৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে বজ্রপাতে। তাদের ৩৫ জনই শ্রমজীবী- কৃষক। তারা মাঠে কাজ করছিলেন। এক গবেষণা বলছে, গত ২৬ বছরে বজ্রাঘাত- বজ্রপাতে মারা যাওয়া ৩ হাজার ৮৬ জনের ৯৩ ভাগই গ্রামের বাসিন্দা। তারা মূলত কৃষিকাজে যুক্ত। ২০১১ সালের আগে প্রতি ১০ লাখে মৃত্যু হার ছিল দশমিক নয়জন। ২০১১-১৬ সাল পর্যন্ত এ হার বেড়ে দাঁড়ায় এক দশমিক আট জনে। গত সাত বছরে মৃত্যু হার বেশি। গতবছর ৫৬ জেলায় বজ্রপাতে ৩১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, হারিকেনের পর সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বেড়েছে। আর এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিই বজ্রপাত বাড়ার কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণায় দেখা গেছে এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ায় ১২ ভাগ বজ্রপাত বেড়েছে। এটা সব স্থানে একই রকম। ২০১০ থেকে এ পর্যন্ত এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বা আরেকটু বেশি তাপমাত্রা বেড়েছে। এই অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অনেক বেশি জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। এ জলীয় বাষ্পই বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে। জলীয় বাষ্প যত বেশি হবে, ততবেশি বজ্রমেঘের সৃষ্টি হবে এবং ঘনঘন বজ্রপাত হবে। তাপমাত্রা যত বাড়বে জলীয়বাষ্প বা এধরণের শক্তিও ততো বাড়বে। তাপমাত্রা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বেশি থাকে। তখন জলীয়বাষ্পও বেশি তৈরি হয়। তাই সকাল ১০ টা থেকে বিকাল পর্যন্ত বজ্রপাত বেশি হয়, মৃত্যুও বেশি ঘটে।

বর্ষার আগে গ্রীষ্মের মার্চ থেকে মে এই তিন মাস দেশের আবহাওয়া সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত থাকে। তার দু’মাস এপ্রিল- মে বজ্রপাতের ভরা মৌসুম। মৌসুম পরিবর্তন বা তারতম্যে যা অনেক সময় জুন পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এরপর বর্ষা মৌসুমে আবার জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বজ্রপাত হয়ে থাকে। এ সময়ের সেপ্টেম্বর- অক্টোবরে আবার বজ্রপাত বেশি হয় । তাই বলা হচ্ছে মার্চ থেকে অক্টোবর বজ্রপাতের সময়। আবহাওয়ার বৈপরীত্যে গত দু’বছরে পরিস্থিতির বেশ অবনতি ঘটেছে। দেশের যে সব অঞ্চলে আগে খুব একটা বজ্রপাত হতো না, এখন সেসব অঞ্চলে বজ্রপাত বেড়ে গেছে। এতে বজ্রপাত প্রবণ এলাকার পরিধিও বেড়েছে । বৃহত্তর সিলেটের তিন জেলার মধ্যে হাওর বেশি সুনামগঞ্জে। দেশের ৫ টি অধিক বজ্রপাত প্রবণ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে এ জেলায়। হাওর এলাকার জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি ও মৎস্য আহরণ। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ভারতের খাসিয়া পাহাড় ও মেঘালয় এলাকায় মার্চ- মে এই তিন মাস মেঘ জমে। মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে এ এলাকার পাদদেশে বজ্রপাতের সংখ্যাও বেশি। হাওড়ের জন্য জলীয়বাষ্পও বেশি হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বজ্রপাতের কম- বেশি বিবেচনায় পুরো দেশকে তিন ভাগ করা হয়েছে। দেশের ১৬ জেলায় – সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, পাবনা, নওগাঁ, বগুড়া, চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, জামালপুর, গাইবান্ধা ও টাঙ্গাইলে বজ্রপাত ও মৃত্যু বেশি। এগুলো বেশি বজ্রপাত প্রবণ এলাকা। দেশের হাওর ও এই জেলাগুলো- উত্তর- পশ্চিমাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। পাশাপাশি গত দু’বছরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এরমধ্যে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের আরও ১৪ জেলাকে নতুন বিস্তার এলাকা বা বজ্রপাত প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশে কম- বেশি ৫০ জেলায় বজ্রপাত হয়। বজ্রপাত সবসময় এক জেলা বা জায়গায় বেশি হচ্ছে – এমনটি নয়। আগে যেখানে কম হতো, এখন সেখানে বেশি হচ্ছে। এর কারণও তাপমাত্রা বৃদ্ধি।

দেশে বজ্রপাতকে ২০১৬ সালে দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়। দুর্যোগ ঘোষণার পর বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। এখন নতুন নতুন জেলা বাড়ায় কুমিল্লাসহ ১৪ জেলাকেও নতুন বিস্তার এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বজ্রপাত প্রকৃতির একটি বিষয় এবং এটি হবেই। তবে বিশেষজ্ঞ মত, প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। কেমন করে। বজ্রঝড়ের তিনটি ধাপ আছে। প্রথম ধাপে বিজলী চমকানো বা বজ্রপাত শুরু হয় না। গর্জন হয় না। প্রথমে মেঘ তৈরি হতে থাকে। তখনও আকাশের অবস্থা ঘন কালো হয় না। এরপর একটু কালো মেঘ তৈরি হয়।

সামান্য ও হালকা বিদ্যুৎ চমকায়। এটা দ্বিতীয় ধাপ। তখনই আপনাকে সচেতন হতে হবে। এমন প্রায় আধঘন্টা সময় পাওয়া যায়। আকাশ কালো হয়ে আসছে, তখনই নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে হবে।

এখন বিশ্বব্যাপী যে কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে তা হলো- বিজলী বা বিদ্যুৎ চমকাতে দেখার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে যদি বজ্রপাতের শব্দ শুনতে পান তাহলে বুঝবেন সেটা আপনার দিকে আসছে, আপনি আক্রান্ত হতে পারেন। আর যদি ৩০ সেকেন্ড পর শব্দ পান তাহলে বুঝবেন সেটা আপনার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

মনে রাখতে হবে বজ্রপাতের সময় বাইরে বা খোলা জায়গায় থাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ। তাছাড়া পানি খুব বেশি বিদ্যুৎ পরিবাহী। তাই বৃষ্টিতে ভেজা যাবে না। চেষ্টা থাকা চাই বজ্রপাতের সময় ঘর থেকে বের না হওয়ার। বাইরে থাকলে দ্রুত পাকা বাড়ি, দালান বা ছাদের নিচে আশ্রয় নেয়া। টিনের, মাটির ঘর নিরাপদ নয়।

নিরাপদ আশ্রয় না পাওয়া গেলে পায়ের আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে খোলা মাঠেই বসে পড়তে হবে, তবে শুয়ে পড়া যাবে না। চামড়ার ভেজা জুতা- সেন্ডেল বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। পা ঢাকা জুতা, রাবারের গামবুট- রাবার বা প্লাস্টিকের জুতা-সেন্ডেল নিরাপদ। মনে রাখবেন, ফাঁকা জমি- মাঠ, খোলা ও উঁচু জায়গা, বড়-উঁচু গাছ- তাল গাছ হলেও খোলা জায়গার যাত্রী ছাউনিতে বজ্রপাতের আশংকা অনেক বেশি। বিদ্যুতের খুটি- লাইন অধিক বিপজ্জনক।

মৃত্যুতো বেশি হচ্ছে গ্রামীন মানুষের- মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী কৃষক, মাছ ধরা জেলে, খেলতে থাকা কিশোর- যুব, বাড়ির পাশে উঠানে থাকা গৃহবধূ। শহরের উঁচু বাসাবাড়িতে বজ্ররোধক দন্ড থাকলেও গ্রামে তেমন উঁচু ভবন নেই। শহরের মানুষ বজ্রপাতের সময় ছাদের নিচে আশ্রয় নিলেও গ্রাম- শহরতলীর খেটে খাওয়া মানুষ মাঠে- ময়দানেই থাকে বেশি। কাজে থাকায় হাতে দা- কাঁচি-কোদাল- খুন্তি – শাবল থাকেই। আর তাই বজ্রপাতের ঝুঁকিতে তারাই সবচেয়ে বেশি রয়েছেন-প্রাণহানির শিকারও হচ্ছেন।

তারা কি সাবধানতা অবলম্বন করবেন। একই সাবধানতা। সাথে সাথে হাতে থাকা ধাতব বস্তু – দা, কাঁচি, কোদাল, খুন্তি একটু দূরে ফেলে দিবে, নিজে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটবে, আর খোলা মাঠে থাকলে বিপদ বুঝে দ্রুত পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়বে। শব্দ বেশি হলে কানে আঙ্গুল দিবে। এটি গ্রামীণ জীবনের পুরনো প্রচলিত ব্যবস্থা। এভাবেই সাধারণ মানুষ নিজেকে রক্ষা করে চলছে বহু আগ থেকে । এটা সবার জন্যে- সর্বজনীন ব্যবস্থা। এটাকেই গুরুত্ব দিতে হবে গ্রামীন- শহুরে সব মানুষকে। এটার অনুশীলন-চর্চাই করতে হবে, জানাতে হবে সকলকে। এটাই মৃত্যু ঝুঁকি এড়ানোর সর্বোত্তম কৌশল। আমাদের সবাইকে এই চর্চায় দক্ষ হতে হবে। তাছাড়া গ্রামের কাঁচা -মাটির ঘরে থাকলে বিছানায় উঠে বসুন। রাবারের জুতা পড়ুন। নৌকায় থাকলে ছাউনির নীচে আশ্রয় নিন।

ঘরের ভেতর থাকলে জানালা বা ধাতব বস্তু- পানির কল, সিড়ির রেলিং, পাইপ এড়িয়ে চলুন। ঘরের জানালা বন্ধ রাখুন। মোবাইল, কম্পিটার, টিভি- ফ্রিজ থেকেও সাবধান, সুইচ বন্ধ রাখা ভালো। সম্ভব হলে সংযোগ প্লাগ আগেই খুলে রাখুন। সকল বিদ্যুত সংযোগ বা যন্ত্র থেকে দূরে থাকুন। রাস্তায় গাড়ীতে থাকলে নিরাপদ পাকা ছাউনির নীচে যেতে চেষ্টা করুন। সম্ভব না হলে- বিপদে পড়ে গেলে গাড়ির ভেতরের ধাতব বস্তু থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখুন। রাস্তায় চলাচলে থাকলে আগে নিজেকে নিরাপদ রাখুন। এভাবেই প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। কারণ বজ্রপাতে শুধু মানুষ নয়, অনেক পশু-পাখিও প্রাণ হারাচ্ছে। এদেরও একই নিরাপত্তা দিতে হবে। বৃষ্টি ও মেঘের গর্জন না থামা পর্যন্ত নিরাপদেই থাকতে হবে।

অনেক সময় বজ্রপাতের আগে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। বিদ্যুতের প্রভাবে চুল খাড়া হয়ে যাওয়া, ত্বক বা চামড়া শিরশির করা বা বিদ্যুৎ অনুভূত করার মত ঘটনা- শিহরণ। আবার আশেপাশে থাকা কোন ধাতব পদার্থ কেঁপে উঠতে পারে। এসব লক্ষণ প্রকাশ পেলে বুঝে নিতে হবে খুব কাছেই বজ্রপাত হবে। তখন দ্রুতই আরও নিরাপদ স্থানে আশ্রয়-সরে যেতে হবে।

বাঁচার উপায় হচ্ছে সচেতনতা, সাবধানতা, নিরাপদ ও সুরক্ষা থাকা। তাই বসতবাড়ি সুরক্ষিত করা। বিল্ডিংয়ে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্হাপন করা। কুমিল্লা এখন উঁচু দালানের শহর। সব দালানে বজ্র নিরোধক দণ্ড আছে, এমনটা নয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিটি কর্পোরেশন তদারকি করলে শহরের আসল চিত্র ও করণীয় বেড়িয়ে আসবে।

তালগাছ বজ্ররোধক। লম্বালম্বি বড় হয়ে উঁচুতে উঠে যাওয়া ও ডালপালা না থাকায় পুকুর পাড়ে,বাঁশ ঝোপে, ফসলের ক্ষেতপাড়ে তালগাছ ছিল, গ্রাম ও শহরতলীতে। এভাবেই এতোদিন প্রকৃতি নিজ ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। ঘর বানানোয় ও ডিংগী নৌকা হিসাবে ব্যবহার ও দুর্যোগে সুরক্ষা দেওয়ায় এর কদর ছিল বেশ। এখন অবশ্য তালগাছের এতোটা দেখা মেলে না। তালগাছ বড় হতে অনেক সময় লাগে, ১৫-২০ বছর লেগে যায় । আবার চারা তৈরিতেও মৌসুম লাগে, বছরে একবারই মৌসুম। তাই সরকার ওই প্রকল্প থেকে সরে এসেছে। তারপরও প্রাকৃতিক ও প্রথাগত পদ্ধতি – যা এখন জরুরি হয়েছে প্রয়োজনেই। শুধু তালগাছ নয় যে কোন উঁচু গাছই সুরক্ষা দেয়, বজ্রপাতসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে। তাই বজ্রপাত ঠেকাতে গাছ লাগানো উচিত বিশেষ করে খোলা মাঠের ধারে। আমরা গুরুত্ব দেই রাস্তার পাশে। এর ফলে উল্টো বজ্রপাত মানুষ বা গাড়ির ওপরই পরবে। ঘন বন বজ্রপাতের জন্য ভালো। কারণ তাপমাত্রা কমায়। গ্রামে ছোট ছোট গাছের ঝোপ থাকলে মানুষ সেখানেও আশ্রয় নিতে পারে। তাপমাত্রা বাড়ার অন্যতম কারণ গাছ, পাহাড়সহ বিনষ্ট করা পরিবেশ।

বজ্রপাতে আহতদের ১০ হাজার ও নিহতদের ২০ হাজার টাকা প্রদানের নিয়ম রয়েছে। একেবারেই নগণ্য। তাও মানা হচ্ছে না। এদিকে বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করা হলেও একে জনস্বাস্থ্যগত দুর্যোগ ঘোষণা করা হয় নি। বজ্রপাতে যারা আহত হচ্ছেন তারা বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। কারণ বজ্রপাতে ডিসি কারেন্ট বা বিদ্যুৎ থাকে। বৈদ্যুতিক শকে আহত রোগী আর বজ্রপাতে আহত রোগীর একই স্বাস্থ্য ঝুঁকি বা ক্ষতি হয়, চিকিৎসাও একই। বজ্রাহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন ঠিক থাকলেও চিকিৎসা নিতে হবে। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে সাথে সাথেই বিদ্যুৎ শকের ব্যক্তির মতো সরাসরি স্পর্শ না করে উদ্ধার করতে হবে।

বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা জানা গেলেও বজ্রপাতের সংখ্যা জানা যায় না। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ৪০ মিনিট আগে বজ্রপাত সর্তকতা জানানোর আন্তর্জাতিক পদ্ধতি আছে, যা আমাদের দেশে এখনও চালু হয় নি। তবে শুধুমাত্র অধিক বজ্রপাত প্রবণ এলাকা হওয়ায় সিলেট আবহাওয়া অফিস ১২ ঘন্টা আগে বজ্রপাতের পূর্বাভাস বার্তা পাঠায়। পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ৩৭০ টি বজ্র নিরোধক দণ্ড বসানোর প্রকল্প শুরুই করা যায় নি। তবে বজ্রপাত প্রবণ ১৫ জেলায় ৩৬০ টি লাইটনিং অ্যারেস্টার বসানো হয়েছে, এতোটুকুই। যার মাধ্যমে কখন, কোন জায়গায় বজ্রপাত হয়েছে তা জানা যায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বজ্রপাত প্রতিরোধের এখন পর্যন্ত কোনো উপায় আবিষ্কার না হলেও সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রাণহানির আশংকা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। অনুশীলনের মাধ্যমে এই অভ্যাসগুলো রপ্ত করে বিপদ কমিয়ে আনা যায়। প্রয়োজন জনসচেতনতা।

প্রযুক্তির যুগে এমন প্রাণহানি অসভ্যতা। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, পরিকল্পনা ও প্রকল্প নেয়া প্রয়োজন । এদিকে গুরুত্ব ও মনোযোগ একেবারেই কম। বাড়ানো দরকার।

পরিচিতিঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।