চলে গেলেন ভাষা সৈনিক আলী তাহের মজুমদার

আমোদ রিপোর্টার।।

চলে গেলেন ভাষা সৈনিক আলী তাহের মজুমদার। শনিবার সকালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার চাঁনপুর নিজ গ্রামে মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ১০৬ বছর। বিকেল ৫ টায় উপজেলার রামপুর ছয়বাড়ী ঈদগা মাঠে জানাযার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। আলী তাহের মজুমদারের জন্ম ১৯১৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি (সনদ অনুযায়ী)। বাবার নাম চারু মজুমদার, মা সাবানী বিবি । মৃত্যুকালে তিনি ২ ছেলে ২ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান।

তার পারিবারিক সূত্র জানায়, আলী তাহের মজুমদার চাঁদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হন কুমিল্লা জিলা স্কুলে। দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ছাত্রাবস্থায় ১৯৩৫ সালে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অষ্টম পাঞ্জাব আর্মিতে যোগ দেন। সাত-আট মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ছুটিতে এসে আর ফিরে যাননি। সে সময় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বোসের পরিকল্পিত বাংলা ভাষাভাষী এলাকা নিয়ে স্বাধীন সরকার গঠনের জন্য কাজও করেছেন আলী তাহের। দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্থান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলেন কুমিল্লার গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। তখন দেশে ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আলী তাহের মজুমদার তখন আরএসপি (রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি) করতেন। ওই অফিসে বসে ভাষা আন্দোলনের লিফলেট-পোস্টার লিখে বিলি করতেন।

বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলি হলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে কুমিল্লার মানুষ। তখন বিক্ষোভ মিছিল করার অপরাধে আলী তাহের মজুমদার কুমিল্লা শহরের রাজগঞ্জে গ্রেফতার হন। পরদিন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগেও দুই দফা গ্রেফতার হয়েছেন আলী তাহের মজুমদার।

১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধুর আহবানে যোগ দেন আওয়ামী মুসলিম লীগে। এই অপরাধে ১৯৫৪ সালে পাকিস্থান সরকারের রোষানলে পড়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন। ১৯৫৬ সালে কারামুক্ত হন। কুমিল্লা সদর থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে চলে যান ভারতে। সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তানিরা তাঁর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। রাজনীতি করেই জীবন কেটেছে তাঁর। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা হয়ে মুক্তিযুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছেন। দেশকে ভালোবাসতেন আলী তাহের মজুমদার । তবে সব ছাপিয়ে ভাষা সৈনিক হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।