ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংবাদিক হয়রানি বন্ধে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টকে স্মারকলিপি


প্রতিবেদক ।।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দিদারুল আলম বলেছেন,’২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর এ জেলায় দায়ের হওয়া রাজনৈতিক মামলায় কোনো পেশাদার সাংবাদিক যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেটি গুরুত্ব সহ দেখা হবে।
পাশাপাশি সব ধরণের অপকর্মের বিরুদ্ধে তিনি জেলার পেশাদার সাংবাদিকদের পক্ষে অবস্থান করবেন বলেও দৃঢ়তার সঙ্গে জানান।
জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গত ৫ আগস্টের পর দায়ের হওয়া নানা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও ফেসবুকে নানাভাবে সিনিয়র সাংবাদিকদের নিয়ে নোংরা ও অসত্য তথ্য দিয়ে তথ্য সন্ত্রাস দ্রুত বন্ধের দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার একটি ‘স্মারকলিপি’ প্রদান করতে গেলে, জেলা প্রশাসক উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্যেশ্যে উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।
এ সময় সাংবাদিকেরা জেলায় প্রতিনিয়ত ঘটে চলা নানা অপসাংবাদিকতা জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরেন। উপস্থিত সাংবাদিকেরা গত মঙ্গলবারের একটি ঘটনা তুলে ধরে বলেন, নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে ওইদিন কক্সবাজার ট্যুরের নামে চাঁদা চায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ভূঁইফোড় একটি সাংবাদিক সংগঠনের কয়েকজন নামধারী সাংবাদিক।
ইউএনও সেসময় তাদের বসিয়ে রেখে খোঁজখবর নেওয়ার মুহূর্তেই সেখান থেকে সটকে পড়েন ওই সংগঠনের কথিত সভাপতি। এই হল অপ সাংবাদিকতার একটি নমুনা।
এ সময় গোটা জেলায় ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম বন্ধে কার্যকরী কোন উদ্যোগ নেই উল্লেখ করে উপস্থিত সাংবাদিক নেতারা আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রকৃত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এখন মিথ্যা মামলা দেয়াসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি সাংবাদিকদের নামে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে হাস্যকর মামলাও। আর তদন্তের আগেই গ্রেপ্তারের নজিরও তৈরি হয়েছে এ জেলায়।’
সভায় উপস্থিত সাংবাদিকেরা বিভিন্ন মামলায় হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা জেলা প্রশাসকের কাছে সবিস্তারে তুলে ধরেন।
এসময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, ‘আমি সব ব্যাপারে সাংবাদিকদের কাছ থেকে কি পরিমাণ সাপোর্ট পেয়েছি সেটা আমি নিজে জানি। এখানকার মূলধারার সাংবাদিকদের মধ্যে আমি নেগেটিভ কোনো কিছু পাইনি।’
এ সময় জেলা প্রশাসকের পাশে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক শংকর কুমার বিশ্বাস এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি জাবেদ রহিম বিজন ও সাধারণ সম্পাদক বাহারুল ইসলাম মোল্লাসহ জেলা সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ও উপজেলার ১৮/২০ জন সাংবাদিকের নামে ঢাকা এবং জেলার বিভিন্ন থানায় এবং আদালতে হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, মামলা মাথায় নিয়ে সাংবাদিকদের কেউ কেউ গ্রেপ্তারের ভয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে বাড়িছাড়া। মাত্র ক’দিন আগে গাজী টিভির ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জহির রায়হানকে একটি হত্যা মামলায় ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। অথচ, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিটি মামলার আর্জিতে আনা অভিযোগ পর্যালোচনা করলে এতে অসত্য, অবান্তর ঘটনা প্রবাহ প্রকাশ সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, আখাউড়ায় দৈনিক যুগান্তর প্রতিনিধি ফজলে রাব্বী ও আরটিভির সাদ্দাম হোসেন ইমিগ্রেশন পুলিশের ঘুষ-দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের জেরে তাদের নামে ইমিগ্রেশনের ওসি মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার নিজে বাদী হয়ে চাঁদাবাজির মামলা করেছেন। রোজায় ইফতারের জন্য চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ এনে ১২ আগস্ট এই মামলা দায়ের করা হয়।
এছাড়া চিহ্নিত কিছু দুষ্কৃতিকারী ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদিতে বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মারাত্মকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করছে জানিয়ে স্মারকলিপিতে বলা হয়, এই সাইভার বুলিং থেকে থেকে ৭০ বা ৮০ ঊর্ধ্ব সাংবাদিকদের বৃদ্ধ মা-বাবারাও রেহাই পাচ্ছেন না। এসব বিষয়ে ৭/৮টি জিডি করা হয়েছে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে। শুধু তাই নয়, এই দুর্বৃত্তরা অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া। এদের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সমাজজীবনও বিষিয়ে উঠেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানিমূলক মামলার প্রতিবাদে গত ২৪ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সমাবেশ হয়। ওই সমাবেশেও অস্বস্তিকর নানা ঘটনার বিবরন তুলে ধরেন সাংবাদিকরা। সভায় জেলা সদরে কর্মরত ৭০ জনেরও বেশি সাংবাদিক বক্তব্য রাখেন।
৭০ বছর বয়স্ক সাংবাদিক আ. ফ. ম. কাউসার এমরান জানান, ফেসবুকে তিনটি পোস্টে হত্যার হুমকি ছাড়াও তার পরিবার নিয়ে লেখা হয়েছে আপত্তিকর কথাবার্তা। এরপর থেকে নিরাপত্তাহীন রয়েছেন। ঘর থেকে বের হন না, এমনকি মসজিদে যেতেও সাহস পান না তিনি।
আজিজুল সঞ্চয় বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেভাবে আক্রমন করা হয়েছে, তা নজিরবিহীন। যদি মামলা হতো বা জেলে যেতাম তাও ভালো ছিল।’
রিফাত আন নাবিল মোল্লা বলেন, ‘সাংবাদিকরা হতাশাগ্রস্ত। যাকে-তাকে আওয়ামী দোসর ট্যাগ দিয়ে মানসিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।’
আল মামুন বলেন, ‘যখন নৌকা প্রতীকে ওপেন সিল মারার নিউজ করেছিলাম তখন ছিলাম বিএনপির। এখন ট্যাগ দিয়ে আওয়ামী লীগ বানাচ্ছে।’
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কারো প্ররোচনায় বা অর্থের বিনিময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যারা লেগেছে তারাও ফ্যাসিবাদ।’
সেলিম পারভেজ বলেন, ‘এখানে পুলিশকে সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে।’
আল আমিন শাহীন বলেন, ‘আমার নামে পতিতার ন্যায় এক নারীকে দিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ানো হয়েছে।’
পীযূষ কান্তি আচার্য বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখন পর্যন্ত যতজন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তারা এসব ঘটনায় কোনোভাবেই জড়িত নয়। হয়রানির উদ্দেশ্যে এসব মামলায় তাদেরকে জড়ানো হয়েছে।’
নিয়াজ মোহাম্মদ খান বিটু বলেন, ‘ভূঁইফোড় সাংবাদিকরা সমাজের কিট। এদের বিরুদ্ধে সবার আগে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
খ আ ম রশিদুল ইসলাম বলেন, ‘এমন সংকটময় পরিস্থিতি আর কখনও আসেনি। অথচ, পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা আমরা তেমনভাবে পাচ্ছি না।’
পরে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি’টি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।।