প্রাচীর ভাঙা এক যোদ্ধার মহাকাব্য

একজন পুত্রের কলমে পিতার প্রতিরোধের কাব্য

মনোয়ার হোসেন রতন।।
নিঃশব্দ গ্রামে জন্ম এক অনলপ্রবাহ মানবের। ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাস। বর্তমান কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম—মান্দ্রা। সেদিন নিসর্গময় শীতপ্রভাতে জন্ম নিয়েছিলেন আমার পিতা—বেলায়েত হোসেন। ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে অগোচরে জন্ম নেওয়া সেই মানুষটি ছিলেন নিভৃত আলোর এক স্ফুলিঙ্গ, এক নিঃশব্দ বিপ্লবের প্রতীক।
উপনিবেশিক শাসনের গাঢ় ছায়ায়, বিভ্রান্ত এক শতাব্দীতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অস্তিত্বের এক নীরব যোদ্ধা। তখনকার মানুষ হয়তো বুঝতেও পারেনি, ইতিহাসের কোন এক পৃষ্ঠায় তাঁর নাম লেখা হবে—নির্যাতিতের হৃদয় থেকে উৎসারিত এক বিজয়গাথার অংশ হিসেবে।
বিশ্বযুদ্ধের বুকে লেখা প্রতিরোধের চিহ্ন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায়। সেই যুদ্ধের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমার পিতা ব্রিটিশ বার্মা রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। বার্মার ঘন জঙ্গল, মালয়েশিয়ার নিঃশব্দ অরণ্য, সিঙ্গাপুরের উত্তপ্ত উপকূল, লাহোরের রুদ্ধশ্বাস ব্যারাক—সবখানে ছিল তাঁর পায়ের চিহ্ন।
কিন্তু তাঁর যুদ্ধ কেবল শত্রুর বিরুদ্ধে ছিল না। তাঁর ভেতরে চলছিল আরেকটি নিঃশব্দ সংগ্রাম—একটি পরাধীন জাতির সন্তান হিসেবে নিজেকে, জাতিকে ও ভবিষ্যৎকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। বন্দুক ছিল তাঁর হাতে, কিন্তু হৃদয়ে ছিল স্বাধীনতার স্পন্দন।
যুদ্ধ শেষে তিনি ফিরে এসেছিলেন—কিন্তু ফিরেছিলেন এক রক্তাক্ত ইতিহাস, ক্লান্ত চোখ, এবং ক্ষত-বহনকারী আত্মা নিয়ে। তিনি তখন আর কেবল একজন মানুষ ছিলেন না—এক জীবন্ত দলিল, এক প্রলয়কালের সাক্ষ্য।
যুদ্ধের পর নতুন এক সংগ্রাম
যুদ্ধ শেষে তিনি বিয়ে করেন লাকসামের, উত্তর দা ইউনিয়নের চন্দনা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে।
১৯৫০ সালে সামরিক জীবনের উর্দি খুলে তিনি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখায় ইংল্যান্ডের লয়েজ ব্যাংকে যোগ দেন। তাঁর মধ্যে তখনও যুদ্ধ চলছিল—কিন্তু এবার যুদ্ধ ছিল সময়ের বিরুদ্ধে, সমাজের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে, নিজের ক্ষতবিক্ষত মন ও স্মৃতির বিরুদ্ধে।
তাঁর মধ্যে সেই প্রাচীন যোদ্ধার ছায়া ছিল, কিন্তু শান্তির খোঁজে যখনই এগিয়ে গেছেন, নিয়তি যেন তাঁকে ঠেলে দিয়েছে আরও এক নতুন লড়াইয়ের দিকে।
১৯৭১: স্বাধীনতার যুদ্ধ আর এক নতুন বন্দিত্ব
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—এইবার যুদ্ধ শুধু বন্দুকের ছিল না, ছিল চেতনার, জাতিসত্তার, এবং অস্তিত্বের। আমার পিতা তখন আর তরুণ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা, সাহস, আর চেতনা তাঁকে আবার দাঁড় করায় ইতিহাসের সম্মুখভাগে।
চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তিনি বন্দি হন। অমানবিক নির্যাতনের হাত থেকে তিনি ফিরে এসেছিলেন—ভাঙা শরীর, ক্ষতবিক্ষত মন, আর বুকভরা যন্ত্রণা নিয়ে।
তাঁর মুখে কখনো উচ্চারিত হয়নি সেই নির্মম অভিজ্ঞতার সব কথা। কিন্তু আমরা, তাঁর সন্তানরা, বুঝতাম—তাঁর নীরবতা ছিল এক দীর্ঘ আহ্বান, এক যুদ্ধের বর্ণনা, এক জাতির কান্না।
বাংকারের নিচে লুকানো ইতিহাস
চট্টগ্রামের বেপারীপাড়া মসজিদের পাশে, আমার বন্ধু জসিম এবং মনির ভাইদের বাড়ির উঠানে আমার পিতা নিজ হাতে নির্মাণ করেছিলেন একটি বাংকার। আজ মনে হয়, সেটা শুধু বাঁচার আশ্রয় ছিল না—ছিল প্রতিরোধের ঘাঁটি, সাহসের দুর্গ, আর ভবিষ্যতের সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া এক মহাকাব্যিক নিদর্শন।
আমরা তখন শিশু। জানতাম না, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যে বাংকারে আমরা খেলতাম, সেখানে লুকিয়ে ছিল এক যোদ্ধার ঘাম, রক্ত আর ইতিহাস। সেই নিরীহ খেলার মাঠেই ছড়িয়ে ছিল ইতিহাসের গোপন পাতাগুলো—যা কখনো বইয়ে লেখা হয়নি।
এক পিতা, এক প্রতীক, এক অনন্ত প্রেরণা
আমার পিতা কখনো বীরের মতো উচ্চকণ্ঠে কিছু বলেননি। তিনি ছিলেন নিঃশব্দ বিজয়ীর প্রতীক। তিনি ইতিহাস রচনা করেননি, কিন্তু ইতিহাস তাঁর শরীর ও মনে লেখা হয়েছিল। আজ আমরা যারা স্বাধীন বাংলাদেশে বেড়ে উঠছি, তাঁরা হয়তো জানিই না, এই মাটি ভিজে আছে কত অশ্রু, কত রক্ত আর কত অসমাপ্ত স্বপ্নে।
আমার পিতা বেলায়েত হোসেন আমাদের প্রজন্মের কাছে শুধু এক নাম নয়—এক গাথা, এক জীবন, এক আদর্শ।
তিনি শিখিয়েছেন, বন্দুক ছাড়াও লড়া যায়, আর নীরবতাও হতে পারে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ।
পিতার সেই ইতিহাস আমার মনে জেগে থাকে প্রতিনিয়ত। এই লেখা কেবল একজন পুত্রের শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়—এটা এক ইতিহাসের পুনরুজ্জীবন, এক নিঃশব্দ যোদ্ধার গল্প। আজকের প্রজন্ম যখন নিজের শিকড় খুঁজে ফিরবে, তখন হয়তো এই গল্পটি তাদের হাত ধরে নিয়ে যাবে সেই সময়ের দরজায়—যেখানে প্রাচীর ভাঙা এক যোদ্ধা দাঁড়িয়ে ছিলেন মাথা উঁচু করে।